ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে বর্ষায় জলাবদ্ধ ও পতিত জমি কাজে লাগিয়ে ভাসমান ডালি পদ্ধতিতে সবজি চাষ কৃষকদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বছরের ৪-৫ মাস পানিতে ডুবে থাকা জমিতে প্রচলিত চাষ সম্ভব না হলেও এ প্রযুক্তিতে উৎপাদনের নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে অনাবাদি জমি কাজে লাগাতে কৃষকদের আগ্রহও বাড়ছে।

হাওর ও জলাভূমি অধ্যুষিত নবীনগর উপজেলায় প্রায় ৮ হাজার ৫০০ হেক্টর কৃষিজমি বর্ষায় দীর্ঘ সময় জলাবদ্ধ থাকে। অন্যান্য সময়ে বোরো ধানসহ ফসল হলেও বর্ষায় অধিকাংশ জমি অনাবাদি পড়ে থাকে। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জলাবদ্ধ জমিকে উৎপাদনের আওতায় আনতে ভাসমান পদ্ধতিতে সবজি চাষের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

উপজেলার ইব্রাহিমপুর, নাটঘর, রছুল্লাবাদ, বড়িকান্দি, সলিমগঞ্জ, নবীনগর পূর্ব ও সাতমোড়া এলাকায় গত দুই বছর ধরে কৃষি বিভাগের পরামর্শে এ পদ্ধতিতে সবজি আবাদ হচ্ছে। চলতি মৌসুমে প্রায় ২০ বিঘা জমিতে চাষ হয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের চলমান ফ্রিপ এবং কুমিল্লা অঞ্চলে টেকসই কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় কৃষকদের সরকারি সহায়তা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দুই শতাধিক কৃষককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। বাঁশের কাঠামোর ওপর মাঁচা করে লতাজাতীয় সবজি—লাউ, চালকুমড়া, শসা ও করলা—এ পদ্ধতিতে ভালো ফলন দেয়।

বর্ষায় বাজারে সবজির সরবরাহ কমলে ভাসমান পদ্ধতিতে উৎপাদিত সবজি বিক্রি করে কৃষকরা বাড়তি আয় করতে পারেন। বর্ষা শেষে ওই কাঠামো দিয়ে আবার জমিতে সবজি আবাদ করা যায়, ফলে পরবর্তী উৎপাদন ব্যয়ও কমে। স্থানীয় কৃষকদের অভিজ্ঞতায় রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ তুলনামূলক কম এবং আলাদা সেচ লাগে না। রাসায়নিক সার ও বালাইনাশক কম ব্যবহারে সবজিও সুস্বাদু হয় বলে জানা যায়।

ইব্রাহিমপুর মধ্যপাড়ার কৃষক ইসমাইল মিয়া বলেন, ‘কৃষি বিভাগের পরামর্শে ভাসমান পদ্ধতিতে সবজি চাষ দুই বছর ধরে আবাদ করছি, আগে বছরে ২-৩ মাস সবজি আবাদ করার সুযোগ ছিল না। আমাকে দেখে এলাকার আরো অনেকেই আগ্রহী হয়ে উঠছে।’

ইব্রাহিমপুর দক্ষিণপাড়ার প্রবাসফেরত সুজন গত বছর প্রশিক্ষণ নিয়ে প্রথমবার ২৫ শতাংশ জমিতে লাউ আবাদ করেন। ইউটিউবে দেখে আগ্রহী হয়ে উপজেলা কৃষি অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তিনি। সহযোগিতায় কলমি শাক, শসা ও লাউ চাষ শুরু করে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০ হাজার টাকা আয় করেছেন। তিনি বলেন, ‘উৎপাদন ভাল হওয়া এবং রোগবালাই কম থাকায় এ পদ্ধতির প্রতি কৃষকদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে।’

রছুল্লাবাদ ইউনিয়নের কৃষক এমরান ২০ শতক জমিতে লাউ ও চালকুমড়া চাষ করেছেন। তিনি ভাসমান ডালি পদ্ধতিতে ১৫ শতাংশ জমিতে লাউ আবাদ করে ইতিমধ্যে প্রায় ১৫ হাজার টাকার লাউ বিক্রি করেছেন। আরও দুই মাস লাউ তুলতে পারবেন বলে জানান।

নবীনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. জাহাঙ্গীর আলম লিটন বলেন, ‘নবীনগরে প্রথমবারের মতো ভাসমান পদ্ধতিতে সবজি চাষ শুরু করা হয়েছে। কৃষকদের হাতে-কলমে এ প্রযুক্তিটি শেখাতে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি প্রদর্শনী স্থাপন, ভাসমান কাঠামো তৈরি, বীজ ও সার দিয়ে সহযোগিতা করা হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ভাসমান পদ্ধতিতে চাষ নিরাপদ কৃষি উৎপাদনের একটি সম্ভাবনাময় প্রযুক্তি। জলাবদ্ধ ও পরিত্যক্ত জমি ব্যবহার করে কম খরচে সবজি উৎপাদন করা সম্ভব। বিশেষ করে লতাজাতীয় সবজির ফলনও এ পদ্ধতিতে ভালো হয়। ভবিষ্যতে নবীনগরের জলাবদ্ধ এলাকাগুলোতে এ প্রযুক্তির ব্যাপক সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে।’